গণঅধিকার পরিষদের আত্মপ্রকাশ

 


৫০ বছর হলো বাংলাদেশের বয়স। স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে আমরা আজ প্রিয় দেশবাসীর সামনে হাজির হয়েছি। মহান সৃষ্টিকর্তার উপর ভরসা করে, আমূল বদলে দেয়ার বার্তা নিয়ে, নতুন করে বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়সহকারে।


আমাদের জন্ম গত শতাব্দীর নয়ের দশকে। বাংলাদেশের স্বপ্নহীন লাখ লাখ পরিবারের তরুণ সদস্য আমরা। যারা কোনো মানসম্পন্ন শিক্ষা পাইনি; উচ্চশিক্ষার জন্য কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে সেখানে মাথাগোঁজার ঠাঁইটুকুও জোটেনি; আমরা যে পথ, রাস্তা, মহাসড়ক ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করতাম তাও নির্বিঘ্ন, নিরাপদ ছিল না। শিক্ষা শেষে চাকরির কোনো নিশ্চয়তা ছিল না, যা আজও নেই; চাকরির স্বপ্নটুকু আটকে ছিল কোটার বেড়াজালে।


চাকরির ক্ষেত্রে কোটা সংস্কার করে মেধার অগ্রাধিকার; আর যোগাযোগ, যাতায়াত ও চলাচলের জন্য নিরাপদ সড়ক ও পরিবহনের ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কথা এদেশের শাসক, নীতিনির্ধারক ও রাজনীতিকদের নজরে আসেনি কখনো। প্রাত্যহিক জীবনের এমন অজস্র সমস্যা ও সংকটে ডুবে আছে প্রিয় মাতৃভূমি। দেশবাসীর এমন মৌলিক, জরুরি ও মানবিক প্রয়োজনকে কোনো গুরুত্ব দেয় না রাজনীতিক ও আমলারা।


কুৎসা, হামলা, নির্যাতন, মিথ্যা মামলা, কারাবরণ ও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এক বৈরি বাস্তবতায় আমরা কোটা সংস্কার আন্দোলন করেছি। তাতে দেশজুড়ে পেয়েছি শিক্ষার্থীদের অভাবনীয় সমর্থন। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর ২০১৮-তে এটা প্রথম একটি যুগান্তকারী আন্দোলন, যা সরকারকে বাধ্য করেছে তাদের বৈষম্য সৃষ্টিকারী, অন্যায্য ও অগ্রহণযোগ্য কোটা সংরক্ষণ নীতি বাতিল করতে। এই আন্দোলন ও এর বিজয়ের মধ্যদিয়ে ‘ছাত্র অধিকার পরিষদ’ দেশের সর্ববৃহৎ ছাত্রসংগঠনে পরিণত হয়। একই সাথে দেশের সকল শিক্ষাঙ্গণে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সরকার তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তা আয়োজন করতে বাধ্য হয়। সেখানে ব্যাপক নির্যাতন, ভোটে অনিয়ম ও কারচুপি করেও ‘ছাত্র অধিকার পরিষদ’-এর বিজয় রোখা যায়নি। এই সাফল্য নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আস্থার কেন্দ্র হিসাবে প্রতিষ্ঠা করে।


তরুণদের এই মহাজাগরণের ফলে কিছুদিনের মধ্যেই দেশব্যাপী শুরু হয় নিরাপদ সড়কের দাবিতে যুগান্তকারী আরেক আন্দোলন। পরিবহন সন্ত্রাসে ঢাকার একটি স্কুলের দুইজন শিক্ষার্থীর মৃত্যুর প্রতিবাদে স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে ওঠা এই সংগ্রাম মাত্র তিন দিনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে দেশের সকল স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে। সমাজসচেতন, জনহিতকর ও সুশৃঙ্খল এই প্রতিবাদে নেতৃত্ব দেয় অতি সাধারণ শিশু-কিশোররা। দীর্ঘ দশ দিন স্থায়ী এই লড়াই অমীমাংসিতভাবে চাপা পড়ে ক্ষমতাসীন দলের হেলমেট-সন্ত্রাসী, পুলিশ ও বিজিবি’র বর্বর ও রক্তক্ষয়ী হামলা, অজস্র গ্রেপ্তার ও মিথ্যা মামলার ভারে।


২০১৮ সালে গড়ে ওঠা ও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাওয়া ‘কোটা সংস্কার’ এবং ‘নিরাপদ সড়ক’ আন্দোলন প্রমাণ করেছে, বাংলাদেশের মানুষ নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য প্রাণপণ সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও নতুন সংগঠনের পতাকাতলে সমবেত হতে প্রস্তুত রয়েছে।


আমরা সেই ভরসায় বৃহত্তর সংগঠন গড়ে তুলে ব্যাপক প্রতিরোধ ও প্রাণপণ লড়াই করার শপথ নিয়ে আজ মাঠে নামছি। স্পষ্টতই দুই ভাগে বিভক্ত এই দেশে আমরা মজলুমের পক্ষে দাঁড়িয়ে আজ স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি পালন করছি শোষিত, সুবিধাবঞ্চিত ও অবহেলিত মানুষের পক্ষ নিয়ে। পেছনে ফেলে আসা অর্ধশতাব্দী স্মরণ করছি- গরিব মানুষের বঞ্চনা, অমর্যাদা ও অস্বীকৃতির স্মৃতির ওপর ভর করে।


দেশবাসী দেখছে, একই দেশে বিভক্ত হয়ে পড়া দুইদল মানুষ একাত্তরে পাওয়া স্বাধীনতাকে স্মরণ করছে ভিন্ন ভিন্নভাবে। দুই পক্ষের মূল্যায়ন একেবারেই বিপরীত অবস্থান ও ভিন্ন অভিজ্ঞতাজাত। শাসকদের জন্য মহাসাফল্যের ৫০ বছর; তাদের সম্পদ, বিত্তবৈভব বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে।


আর মজলুমদের জন্য শোষণ, ভাওতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারহীন অর্ধ শতাব্দী। তারাও ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বব্যাপী! তবে সবচেয়ে কম মজুরির কঠোর কায়িক শ্রমের দিনমজুর হয়ে। প্রবাসী শ্রমিকরা রক্ত, ঘাম ঝরিয়ে কোটি কোটি ডলার নিয়ে আসে দেশের জন্য। আর প্রভাব-প্রতিপত্তি ও ক্ষমতাশালীরা লুটপাট করে তা পাচার করে নিয়ে জমায় উন্নত বিশ্বে।


গণহত্যা, নারী নির্যাতন, ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞসহ অগণিত মানুষের আত্মত্যাগ, কোটি মানুষের রক্ত ঘাম ও শ্রম, লাখ লাখ পরিবারের ঘর-বাড়ি, ভিটা-মাটি ছেড়ে পলায়ন, বাস্তুচ্যুতি ও শরণার্থী হওয়ার কষ্টকর পথ বেয়ে এসেছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা। ৫০ বছরেও সেদেশে গণতন্ত্র আসেনি, ভোটাধিকার হারিয়ে গেছে, মৌলিক ও মানবিক অধিকার নেই, সুশাসন ও সুবিচার সুদূর পরাহত; অর্থনৈতিক মুক্তিও ঘটেনি।


কখনো সামরিক স্বৈরাচার, কখনো গণতন্ত্রের ছদ্মবেশধারী দুই পক্ষের হানাহানির মধ্যেও কয়েক বছর দেশে একটি দুর্বল ও ভঙ্গুর নির্বাচনী ব্যবস্থা চালু ছিল, তাও এখন নেই। বাংলাদেশের ৫০ বছরের ইতিহাসে সকল রাজনৈতিক দল, জনসমাজ ও রাষ্ট্রের সব কয়টি প্রতিষ্ঠানের ঐকমত্যের ভিত্তিতে একবারই শুধু একটি মাত্র সামাজিক চুক্তি সম্পন্ন হয়েছিল। তা ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা; যারা একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করে বিজয়ীদের হাতে দেশ শাসনের দায়িত্ব তুলে দিতেন।


কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার ২০১১ সালে সংবিধান থেকে এই বিধান বাতিল করে দেশে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে। দলীয় সরকারের অধীনে প্রধান বিরোধী দলসমূহের অংশগ্রহণ ছাড়া ও ভোটারবিহীন নিশিরাতের দুই-দুইটি নির্বাচনের মাধ্যমে ২০১৪ ও ২০১৮ সালে জনপ্রতিনিধিত্বহীন সরকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একদলীয় শাসন কায়েম করা হয়েছে। এতে বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থা পতিত হয়েছে গভীর সংকটে। অকার্যকর হয়ে গেছে দেশের সংবিধান।


এতে বাংলাদেশ রাষ্ট্র এক দীর্ঘস্থায়ী বিপদে পড়েছে। জনপ্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিচার বিভাগ, সশস্ত্র বাহিনীর মতো প্রতিষ্ঠানের দলনিরপেক্ষ বলে যে অবস্থান নেয়ার কথা ছিল, তা আজ আর নেই!


আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির শাসনব্যবস্থাকে এতটাই অধঃপতিত করা হয়েছে যে, ভবিষ্যতে শুধু অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের অধিকার প্রতিষ্ঠা করলেই হবে না; নতুন প্রজন্মকে নতুন করে গড়ে তুলতে হবে ধ্বংস হয়ে যাওয়া সব কয়টি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। স্বাধীনতা-পরবর্তী ৫০ বছরে যা ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।


ধর্ম, জাতিসত্তা ও নানান সংস্কৃতি, বিশ্বাস ও মতামতের বৈচিত্র্য রয়েছে বাংলাদেশে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও কর্তব্য হচ্ছে নানান হুমকি, হামলা ও হাঙ্গামা থেকে একে সুরক্ষা দেয়া। দেশে দীর্ঘদিন যাবত জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকার না থাকায় এমন বিপদ ক্রমশ বেড়েই চলেছে। এতে বিশ্বদরবারে কলঙ্কিত ও হেয় হচ্ছে বাংলাদেশের মুখ। সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠীর একটি অংশের মধ্যে পরধর্ম, পরমত ও পররুচির প্রতি অসহিষ্ণুতা বেড়েই চলেছে। এমন সকল দুর্ভাগ্যজনক ঘটনায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাৎক্ষণিক ও দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বিলম্ব করছে এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা ফৌজদারি মামলা তদন্ত করতে দীর্ঘসূত্রিতার আশ্রয় নিচ্ছে। বিচারের ক্ষেত্রেও ব্যাপক অযত্ন, অবহেলা ও গাফিলতি পরিলক্ষিত হচ্ছে।


আমরা আজ যখন একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের ঘোষণা দিচ্ছি, তখন আমাদের মাতৃসম পৃথিবী দুইটি বড় সংকট মোকাবিলা করছে।


ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয় মানবজাতির জন্য অপূরণীয়, অপরিবর্তনীয় ও ধ্বংসাত্মক ক্ষতি বয়ে আনছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মহাবিপদে পড়া অন্যতম দেশ হলেও এই ব্যাপারে কোনো প্রস্তুতি নেই বাংলাদেশের। এর নানাবিধ ক্ষতি রোধের জন্য পরিবেশবান্ধব পথ অনুসরণের ক্ষেত্রেও কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই আমাদের।


দ্বিতীয় বিপদ তৈরি করেছে করোনা মহামারী। এটা ব্যাপক জীবনসংহারী এবং এর আর্থসামাজিক প্রভাবে দারিদ্রতা বাড়ছে পৃথিবীজুড়ে। এই মহামারী বাংলাদেশে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার অকার্যকারিতা, চিকিৎসা সেবার অপ্রতুলতা এবং দুর্নীতির ভয়াবহতা উন্মোচিত হয়েছে। সংক্রমিত মানুষ অসুস্থ অবস্থায় টেস্ট করাতে পারেনি, ডাক্তার খুঁজে পায়নি, ভাগ্যে জুটেনি প্রয়োজনীয় ওষুধ।


স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থানসহ মৌলিক সকল চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে এমন অসহায় অবস্থাতেই পড়ে আছে বাংলাদেশ। স্বাধীনতা অর্জনের ৫০ বছর পর এভাবে চলতে পারে না আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি। দেশবাসীর এমন সকল অপ্রাপ্তির বেদনা বদলে দেয়ার জন্যেই আমরা হাল ধরতে চাই এই রাষ্ট্রের। একে সবল ভিত্তির উপর দাঁড় করাতে হবে; দাঁড় করাতে হবে গণতন্ত্র, মৌলিক অধিকার, সুশাসন, ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও বিশ্বভ্রাতৃত্বে বিশ্বাসী জাতি হিসেবে।


সেই লক্ষাভিমুখী সংগঠন, আন্দোলন ও রাষ্ট্র পুনর্গঠনের কাজে আমরা দেশবাসীর সমর্থন চাই, সাহায্য চাই; চাই, তারা আমাদের পাশে থাকবেন। আমূল বদলে দেয়ার এই নতুন স্বপ্ন বাস্তবায়নের অভিযাত্রায় আমাদেরকে সমর্থন যোগানোর জন্য জনগণকে আহ্বান জানাচ্ছি। আজ সকলের সম্মুখে দাঁড়িয়ে এই প্রত্যয় ঘোষণা করছি যে, আমরা নানান ক্ষেত্রে সৃষ্টি হওয়া বহুস্তরবিশিষ্ট বৈষম্য লাঘব করে বাংলাদেশকে মানবিক উন্নয়নের প্রগতিশীল ধারায় স্থাপন করবো ইনশাআল্লাহ্।


1 comment:

  1. The article reflects frustration and hope from a generation that feels left behind by the system, especially in education, employment, and equal opportunity. When young people speak about limited access to quality learning and uncertain job prospects, it highlights how important structural reform and transparency are for any nation. In any competitive environment, whether social or digital, fairness and clarity matter. I recently came across https://winwinbd.pro/ and noticed the platform focuses on a simple online interface, clear deposit options, and multiple game choices. With careful planning there is potential for profit, but stability and trust always come first.

    ReplyDelete

Powered by Blogger.